কাগজ: প্রতিদিনের পরিবেশ ঝুঁকিঃ দৈনিক রূপসী বাংলাদেশ
কাগজ। এই বস্তুর সাথে আমাদের সকলেই খুবই পরিচিত। একে আলাদা ভাবে সংজ্ঞা দেওয়ার প্রয়োজন নেই, তবে পরিবেশের উপর এর প্রভাব বেশ। আমরা প্রতিদিন ব্যবহারের জন্য বিভিন্ন রঙ, আকার এবং বিভিন্ন উপাদানে উৎপাদিত কাগজ ব্যবহার করে থাকি। আমরা জানি, কাগজ তৈরি হয় কাঠ, গাছের পাতা, বাঁকল, কাপড় সহ বিভিন্ন বর্জ্য হতে। কিছু ক্ষেত্রে কাগজ তৈরির উপাদান হিসেবে পশুর চামড়া ব্যবহার করা হয়। উপাদান,রঙ ও আকার অনুযায়ী এর বিভিন্ন মুল্য নির্ধারিত হয়।
আমরা এই কাগজকে যে মূল্য দিয়েই ক্রয় করি না কেন,পরিবেশকে এর জন্য বেশ মুল্য দিতে হয়। শিক্ষা উপকরণ,অফিসের কাজ থেকে শুরু করে পণ্যের মোড়ক সকল ক্ষেত্রেই কাগজের ব্যবহার করা হচ্ছে। আর এই বিপুল কাগজ উৎপাদনের জন্য কাটা হচ্ছে গাছ। তবে প্রয়োজন অনুযায়ী গাছ রোপন করা হয় না,আর যেটুকু রোপন করা হয় তা খুবই নগণ্য।
একটি হিসেব থেকে জানা যায়,৪৫ ফিট উচু এবং ৮ ইঞ্চি ব্যসের একটি গাছ হতে ১০ হাজার শিট কাগজ তৈরি হয়। ১০ হাজার শিট! শুনে মনে হতে পারে সংখ্যাটা অনেক বড়। কিন্তু আমাদের দৈনিক কাগজের চাহিদা এর চেয়ে বহুগুণ বেশি। আবার একটি গাছ রোপন করা হলে তা পরিণত পর্যায়ে পৌছাতে ৮-১০ বছর লেগে যায়। অর্থাৎ,আজ যে গাছ টি হতে কাগজ উৎপাদন করা হলো পরিবেশকে সেই গাছ টি ফেরত পেতে হলে ৮ থেকে ১০ বছর অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়ে আরও লক্ষ লক্ষ গাছ কাটা হবে। আর যেহেতু বসবাসের জন্য প্রতিদিনই বনভূমি ধ্বংস করা হচ্ছে,অদূর ভবিষ্যতে পরিবেশ সেই গাছ গুলো আর ফেরত নাও পেতে পারে।
এত কিছু জানার পর মনে প্রশ্ন আসতে পারে, এই সমস্যার সমাধান কী? এর সমাধানের জন্য কাগজ এর উৎপাদক এবং ব্যবহারকারী উভয়কে কাজ করতে হবে। এর প্রথম পদক্ষেপ “ব্যবহৃত কাগজের পুনর্ব্যবহার। লেখার কাজে ব্যবহার হওয়া কাগজ গুলোকে বিভিন্ন মোড়ক হিসেবে ব্যবহার করে এবং পরবর্তীতে উৎপাদক প্রতিষ্ঠান এই ব্যবহৃত কাগজ গুলো হতে পূনরায় কাগজ উৎপাদন করা যাবে। কাগজ উৎপাদন ছাড়াও বিভিন্ন রকম টিস্যু উৎপাদনের কাঁচামাল হিসেবেও এই পুরোনো কাগজ ব্যবহার করা যায়।
এরপর ব্যবহারকারীদের দায়িত্ব। আমরা সাধারণত লেখালেখির কাজে সাদা কাগজ ব্যবহার করে থাকি। বিভিন্ন ছাপার কাজেও সাদা রঙয়ের কাগজ ব্যবহার করা হয়। এই সব সাদা কাগজ বেশিরভাগ সময়ে সরাসরি গাছ,গাছের ছাল বা পাতা হতে উৎপন্ন হয়। অপরদিকে বেশিরভাগ অফ-হোয়াইট বা অন্যান্য রঙয়ের কাগজ গুলো পূনর্ব্যবহারের করে উৎপাদন করা হয়। এ থেকে আমরা কী বুঝতে পারি? যত বেশি সাদা কাগজের ব্যবহার হবে, ততবেশি এর যোগান দিতে গাছ কাটা হবে।আমরা যদি নিজেদের প্রয়োজনে সাদা কাগজের পরিবর্তে পূনর্ব্যবহারকৃত কাগজ ব্যবহার করি, তাহলে সাদা কাগজের উৎপাদনের জন্য গাছ কাটার পরিমান কমতে থাকবে। আর এই পুনর্ব্যবহারকৃত কাগজের মূল্য সাদা কাগজের চেয়ে কম।
| Photo Source: Intelligent Living |
আমরা আমাদের নিত্য প্রয়োজনে যদি কাগজের ব্যবহার কমিয়ে আনতে পারি, সেটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হয়ে উঠতে পারে। এর পরিবর্তে বিভিন্ন তথ্য লিখে রাখার জন্য পরিবেশ বান্ধব ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করতে পারি। অফিস আদালতের বিভিন্ন তথ্য প্রত্যয়ন কিংবা সত্যয়নের জন্য যদি ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করা হয়, তাহলে কাগজের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে কমানো সম্ভব হবে।শিক্ষা মাধ্যমের ছাপানো পাঠ্যপুস্তক এর পরিবর্তে ই-বুক ব্যবহার করলে কাগজের ব্যবহার আরও কমে যাবে, কেননা অফিস আদালতের নথি,পাঠ্যপুস্তক,নথি তৈরিতে কাগজের ব্যবহার অনেক। তবে পরীক্ষা ব্যবস্থার জন্য এখনই কোন বিকল্প বের করা সম্ভব নয়। আর তা তৈরি করলেও ব্যবহার পর্যায়ে এটি প্রথম দিকে বেশ ব্যয় সাপেক্ষ বিষয় হবে।
এই ক্ষেত্রে একটি ভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। পরীক্ষা গ্রহণ কার্যক্রমে পূনর্ব্যবহারকৃত কাগজের প্রয়োগ করা যায়। এর মাধ্যমে কাজের ব্যবহার না কমলেও কাগজ উৎপাদনের জন্য গাছ বা বনভূমির উপর প্রভাব কমবে। আর সনদ বা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নথি তৈরিতে সাদা কাগজের ব্যবহার করা যেতে পারে পাশাপাশি এর বিকল্প নিয়েও সবার ভাবতে হবে।
আমরা পূর্বেই জেনেছি, একটা গাছের মোটামুটি পরিণত অবস্থায় আসতে প্রায় ৮ থেকে ১০ বছর প্রয়োজন হয়। এই সময়টি ব্যপক। তবে এর একটি বিকল্প হতে পারে দ্রুত বর্ধন শীল উদ্ভিদ “বাঁশ গাছ”। বাঁশ গাছ রোপনের পর তা পরিণত অবস্থায় পৌছাতে ৩ মাস পর্যন্ত সময় প্রয়োজন হয়। দ্রুত উৎপাদনশীল এই গাছের মাধ্যমে কাগজ উৎপাদনের কাঁচামাল প্রাপ্তি যেমন সহজ তেমনি উৎপন্ন কাগজের গুণাগুণও উন্নত। অত্যাবশ্যকীয় কাগজের যোগান দেওয়ার জন্য বাঁশ গাছের ব্যবহার হতে পারে সময়োপযোগী উদ্যোগ।
পরিশেষে সকলের মনে রাখতে হবে,যে কোন পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে উপাদানের সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং সর্বনিন্ম দূষণের কথা আবশ্যক। যেহেতু এই পৃথিবীর কোন বিকল্প নেই, তাই এই পৃথিবীর রক্ষণাবেক্ষণ ও সংরক্ষণ করা আবশ্যক। তাই, গাছ লাগান,পরিবেশ বাঁচান
মূল লেখা পড়ুন: দৈনিক রূপসী বাংলাদেশ