কালোজিরা’র উপকারিতা এবং ব্যবহার

কালোজিরা। কালো ক্ষুদ্র দানাদার এই ফসলকে সকলেই কম বেশি চিনি। উপমহাদেশে এটি ঔষধ, মসলা, তেল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এর রয়েছে বেশ কিছু ঔষধি গুণাগুণ যার জন্য আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে এবং প্রাচীন ইউনানি চিকিৎসা পদ্ধতিতে এর ব্যাপক আলোচনা রয়েছে।

কালোজিরা কে ইংরেজিতে বলা হয় Black Cumin বৈজ্ঞানিক নাম Nigella Sativa Linn কালোজিরার গাছ মাঝারি আকৃতির মৌসুমি গাছ,একবার ফুল ও ফল হয়। এর স্ত্রী,পুরুষ দুই ধরনের ফুল হয়; রং সাধারণত হয় নীলচে সাদা (জাত বিশেষে হলুদাভ),পাঁচটি পাঁপড়ি বিশিষ্ট । কিনারায় একটা বাড়তি অংশ থাকে। তিন-কোনা আকৃতির কালো রং এর বীজ হয়। গোলাকার ফল এবং প্রতিটি ফলে ২০-২৫ টি বীজ হয়ে থাকে।

কালোজিরাতে মোট আমিষ ২১ শতাংশ,শর্করা ৩৮ শতাংশ,ভেষজ তেল ৩৫ শতাংশ। এছাড়াও রয়েছে নাইলোজেন,থাইমোকিন। কালোজিরা হতে নিঃস্বৃত তেলে রয়েছে লিনোনিক অ্যাসিড, অলিক অ্যাসিড,ফসফেট, লৌহ, ফসফরাস, শর্করা,ক্যালসিয়াম,পটাশিয়াম,আয়রন,জিংক,মুয়াগনেশিয়াম,ভিটামিন-এ,বি,সি সহ বিভিন্ন জীবাণুনাশক উপাদান ও রোগ নিরাময় শক্তি।

কালোজিরার ঔষধি গুণ সম্পর্কে বিভিন্ন গ্রন্থে বর্ণনা রয়েছে।ইসলাম ধর্মে হাদিসে বর্ণনা করা হয়েছে এভাবে,

“কালজিরায় মৃত্যু ব্যতীত সব রোগের ঔষধ রয়েছে”

আয়ুর্বেদ,ইউনানি,কবিরাজি সকল চিকিৎসা গ্রন্থে কালোজিরা নিয়ে ব্যাপক ভাবে উল্লেখ রয়েছে।লোকজ চিকিৎসা তথা টোটকা তেও কালোজিরা ব্যবহার হয়ে আসছে।

কালোজিরা সচরাচর আমরা রান্নার বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করে থাকি। রান্নাকে সুস্বাদু ও সুগন্ধপূর্ণ করতে কালোজিরার ব্যবহার বেশ পুরোনো। তাই জেনে হোক বা না জেনে, কালোজিরার সুফল আমরা প্রায় সবাই ভোগ করছি কোন না কোন ভাবে। তবে এর ঔষধি গুণ পাওয়ার জন্য পরিমাণ ও পদ্ধতি গুলো সঠিক হুয়া দরকার।

যেমন:

  • ১। লেবুর রস ও কালোজিরা: লেবুর রস ও কালোজিরার তেল একসাথে মিশিতে ত্বকে ব্যবহার করলে ব্রণ ও দাগ অদৃশ্য হয়ে যাবে।
  • ২। সরিষা ও কালোজিরার তেল: আয়ুর্বেদ এ সরিষার তেল ও কালোজিরার তেলের সমন্বয়ে ব্যথা নিরাময় হওয়ার বর্ণনা পাওয়া যায় এবং এটি বেশ কার্যকরী।
  • ৩। কালোজিরার তেল: মাথাব্যথা উপশমে কালোজিরার তেল উপকার দেয়।
  • ৪। কালোজিরাতে এন্টি-অক্সিডেন্ট এর উপস্থিতি লক্ষণীয়। কালোজিরা সেবন লিভার ও কিডনিকে বিভিন্ন ক্ষতি হতে রক্ষা করে।
  • ৫। কালোজিরা ডায়েট এ বেশ ভূমিকা রাখে। সুস্বাস্থ্য তৈরিতে কালোজিরা গ্রহণ দ্রুত ফলাফল দেয় বলে বিশেষজ্ঞদের মতামত রয়েছে।
  • ৭।কালোজিরা নিয়মিত গ্রহণ করলে শরীরে রক্ত সঞ্চালন হার বৃদ্ধি পায়,রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং স্মৃতি শক্তি বৃদ্ধি পায়।
  • ৮।কালোজিরা হাঁপানি বা শ্বাসকষ্ট রোগে উপশম দেয়। তাই দীর্ঘদিন যাবত মানুষ কালোজিরার ভর্তা হাঁপানি রোগীর পথ্য হিসেবে ব্যবহার কুরে আসছে।
  • ৯। বর্তমান সময়ে ডায়বেটিস বিপজ্জনক রোগ পরিণত হয়েছে। এই অবস্থায় কালোজিরা খাওয়ার অভ্যাস ডায়বেটিস নিয়ন্ত্রণে আনতে সহযোগিতা করবে। ডায়বেটিস আক্রান্ত ৯৪ জনের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১২সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন ২গ্রাম কালোজিরা খেলে এলডিএল কোলেস্টেরল কমে যায়।
  • ১০। কালোজিরার গুরো তেল এর সাথে মিশিয়ে চুলকানি তে মলমের মতো ব্যবহার করা যায়। এতে খুব দ্রুত ও কার্যকর ফলাফল পাওয়া যায়।

এছাড়া কালোজিরার তেল চুলপড়া, চুলের গোড়া শক্ত করা সহ বিভিন্ন চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়।

কালোজিরার অন্যতম একটি গুণ হলো এটি ক্যান্সার প্রতিরোধে সহযোগিতা করে। গবেষণায় দেখা গেছে,কালোজিরার বিভিন্ন উপাদান অগ্ন্যাশয়,ফুসফুস,জরায়ু, প্রোস্টেট,ত্বক ও কোলন ক্যান্সার সহ বিভিন্ন ক্যান্সারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে।

আমরা জানি কোন কিছুই তার প্রয়োজনের বেশী গ্রহণ করলে ক্ষতির কারণ হয়,কালোজিরার ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। কালোজিরা নিয়মিত ও পরিমিত খেতে হয়। অতিরিক্ত বা খুব বেশি খেলে বা ব্যবহার করলে ফলাফল হিতে বিপরীত হয়। কালোজিরার তেল গর্ভাবস্থায় গ্রহণ করা যাবে না। গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত কালোজিরা খেলে গর্ভপাতের সম্ভাবনা থাকে। কালোজিরা গ্রহণ করার সবটাই করতে হবে পরিমিত পর্যায়ে। অনেকেই কালিজিরা হজম করতে পারেন না। তবে আস্তে আস্তে অভ্যাস করলে ভালো। যারা সহজে কালিজিরা হজম করতে পারেন না তারা খাবেন না, যারা পারেন তারাই নিয়মিত পরিমিত খাবেন। গর্ভাবস্থায় ও দুই বছরের কম বয়সের বাচ্চাদের কালিজিরার তেল সেবন করানো উচিত নয়। নকল বা কৃত্রিম কালোজিরার তেল কখনও খাওয়া ঠিক না,এতে বিভিন্ন অপদ্রব্য মিশ্রিত থাকে যা গ্রহণে শরীরের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। তাই জেনে শুনে বুঝে নিশ্চিত হয়ে কালিজিরা বা কালিজিরার তেল সরাসরি বা প্রক্রিয়াজাত করে খেতে হবে। পুরোনো কালিজিরা তেল স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকারক। তাই এই ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।

তথ্যসূত্র: সংবাদপত্র,  স্বাস্থ্যসেবা তথ্য সরবরাহক বিভিন্ন সুত্র।