স্ট্রেস হরমোন ‘কর্টিসল’ ও খাদ্যাভ্যাস: কী খাবেন, কী এড়িয়ে চলবেন?
মানসিক চাপের সময় শরীরের ভেতরে যে পরিবর্তনগুলো ঘটে, তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো কর্টিসল (Cortisol) হরমোনের নিঃসরণ। কর্মক্ষেত্রের চাপ, ঘুমের ঘাটতি, অসুস্থতা কিংবা অন্য কোনো শারীরিক বা মানসিক চাপের প্রতিক্রিয়ায় শরীর কর্টিসল বাড়াতে পারে। এটি নিজে কোনো ‘খারাপ’ হরমোন নয়; বরং রক্তে গ্লুকোজ সরবরাহ, রক্তচাপ ও বিপাকীয় কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণসহ চাপ মোকাবিলায় কর্টিসলের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
তবে দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেস ও কর্টিসল নিয়ন্ত্রণের স্বাভাবিক ছন্দে পরিবর্তন হলে তা স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এ ক্ষেত্রে খাদ্যাভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ হলেও, কোনো একটি খাবারকে ‘কর্টিসল কমানোর খাবার’ হিসেবে চিহ্নিত করার মতো শক্তিশালী প্রমাণ সব ক্ষেত্রে নেই।
খাবার ও কর্টিসলের সম্পর্ক কোথায়?
খাদ্যাভ্যাস কর্টিসল ব্যবস্থাকে বিভিন্ন উপায়ে প্রভাবিত করতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা বা খুব কঠোর ক্যালরি-নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে cortisol সাময়িকভাবে বেড়ে যেতে পারে। একটি systematic review ও meta-analysis-এ দেখা গেছে, fasting-এর সময় রক্তের cortisol উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে; তুলনামূলক কম মাত্রার calorie restriction-এর ক্ষেত্রে এই প্রভাব একই রকম ছিল না।
অন্যদিকে, রক্তে শর্করার ওঠানামা, খাবারের সময়, মোট ক্যালরি গ্রহণ এবং ব্যক্তির বিপাকীয় অবস্থা—সবকিছু মিলেই stress response-কে প্রভাবিত করতে পারে। তাই শুধু ‘চিনি খেলেই cortisol বেড়ে যায়’—এমন সরল সিদ্ধান্তে যাওয়া ঠিক নয়।
অতিরিক্ত চিনি ও অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার কতটা সমস্যা?
চিনি, refined carbohydrate এবং ultra-processed food অতিরিক্ত খাওয়ার পরিবর্তে পূর্ণশস্য, শাকসবজি, ফল, ডাল, বাদাম ও পর্যাপ্ত প্রোটিনভিত্তিক ভারসাম্যপূর্ণ খাদ্য বেছে নেওয়া ভালো। এর কারণ শুধু cortisol নয়। দীর্ঘমেয়াদে অতিরিক্ত added sugar ও highly processed খাবার ওজন বৃদ্ধি, বিপাকীয় স্বাস্থ্যের অবনতি এবং সামগ্রিক খাদ্যমানের অবনতির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তাই ‘কর্টিসল কমাতে’ চিনি পুরোপুরি বাদ দেওয়ার চেয়ে অতিরিক্ত মিষ্টি ও চিনিযুক্ত পানীয় কমিয়ে সামগ্রিক খাদ্যমান উন্নত করা বেশি বাস্তবসম্মত।
ক্যাফেইন: সবার জন্য কি একই নিয়ম?
চা ও কফির ক্যাফেইন কিছু মানুষের ক্ষেত্রে cortisol সাময়িকভাবে বাড়াতে পারে। নিয়ন্ত্রিত গবেষণায় caffeine গ্রহণের পর cortisol বৃদ্ধির প্রমাণ পাওয়া গেছে, বিশেষ করে যারা নিয়মিত caffeine গ্রহণ করেন না তাদের ক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়া বেশি হতে পারে। আবার নিয়মিত caffeine গ্রহণকারীদের ক্ষেত্রে কিছুটা tolerance তৈরি হতে পারে।
তাই কফি বা চা মানেই ‘খারাপ’—এমন ধারণা ঠিক নয়। তবে অতিরিক্ত caffeine, বিশেষ করে দিনের শেষভাগে গ্রহণ করলে ঘুমের সমস্যা তৈরি করতে পারে। আর পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব নিজেই stress regulation-কে প্রভাবিত করতে পারে।
তাহলে কী খাবেন?
- ম্যাগনেসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার: বাদাম, বীজ, শাকসবজি, ডাল ও পূর্ণশস্যের মতো magnesium-rich খাবার স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে। Magnesium ও anxiety/stress-এর সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা রয়েছে, তবে এটিকে সরাসরি ‘cortisol-lowering treatment’ বলা যায় না। একটি systematic review-তে magnesium supplementation-এর সম্ভাব্য উপকারের ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও গবেষণার মান ও ফলাফলে যথেষ্ট বৈচিত্র্য ছিল।
- ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ খাবার: ইলিশ, সামুদ্রিক চর্বিযুক্ত মাছ, আখরোট ও কিছু বীজ থেকে omega-3 পাওয়া যায়। Omega-3-এর প্রদাহ ও মানসিক স্বাস্থ্যের বিভিন্ন সূচকের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে গবেষণা চলছে। তবে শুধু cortisol কমানোর জন্য omega-3 খাওয়ার পরামর্শ দেওয়ার মতো চূড়ান্ত প্রমাণ নেই।
- ফল ও শাকসবজি: পেয়ারা, কমলা, লেবু, ক্যাপসিকামসহ vitamin C-সমৃদ্ধ খাবার এবং বিভিন্ন রঙের ফল-সবজি খাদ্যতালিকায় রাখা ভালো। Vitamin C-এর সঙ্গে stress response নিয়ে গবেষণা থাকলেও সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো ফলকে ‘কর্টিসল কমানোর ওষুধ’ হিসেবে দেখা উচিত নয়।
- পূর্ণশস্য ও জটিল কার্বোহাইড্রেট: ওটস, লাল চাল, আটার রুটি, ডাল ও মিষ্টি আলুর মতো minimally processed carbohydrate খাবার দীর্ঘস্থায়ী ও সুষম খাদ্যাভ্যাসের অংশ হতে পারে। এগুলোর সঙ্গে protein, healthy fat ও vegetables মিলিয়ে খেলে খাবারের সামগ্রিক পুষ্টিমান আরও উন্নত হয়।
Gut-brain axis কি সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ?
অন্ত্র ও মস্তিষ্কের মধ্যে দ্বিমুখী যোগাযোগ রয়েছে, যাকে gut-brain axis বলা হয়। অন্ত্রের microbiome, খাদ্যাভ্যাস, immune response এবং মানসিক স্বাস্থ্যের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা দ্রুত এগোচ্ছে।
তবে টক দই বা fermented food খেলেই cortisol কমে যাবে—এমন সরাসরি সিদ্ধান্ত এখনো বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। বরং বিভিন্ন ধরনের fibre-rich plant food, fermented food এবং সামগ্রিকভাবে বৈচিত্র্যময় খাদ্যাভ্যাসকে অগ্রাধিকার দেওয়া বেশি যুক্তিসঙ্গত।
শুধু খাবার দিয়ে কর্টিসল নিয়ন্ত্রণ সম্ভব?
না। কর্টিসল নিয়ন্ত্রণে খাদ্যাভ্যাসের পাশাপাশি ঘুম, শারীরিক কার্যক্রম, মানসিক চাপের মাত্রা এবং সামগ্রিক জীবনযাপন গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে দীর্ঘস্থায়ী stress, ঘুমের ঘাটতি বা অতিরিক্ত calorie restriction থাকলে শুধু কোনো ‘বিশেষ খাবার’ যোগ করে সমস্যার সমাধান হবে না।
শেষ কথা
কর্টিসল শরীরের শত্রু নয়—এটি প্রয়োজনীয় একটি হরমোন। লক্ষ্য হওয়া উচিত কর্টিসলকে কৃত্রিমভাবে ‘শূন্যে নামানো’ নয়; বরং স্বাভাবিক stress response ও দৈনন্দিন স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন বজায় রাখা।
খাদ্যতালিকায় বেশি রাখুন শাকসবজি, ফল, পূর্ণশস্য, ডাল, মাছ, বাদাম ও বীজ। কমান অতিরিক্ত added sugar, highly processed food এবং প্রয়োজনের তুলনায় বেশি caffeine। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম এবং stress management-কে গুরুত্ব দিন।
আর একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—শুধু cortisol-এর কোনো একটি রক্ত বা লালা পরীক্ষার ফল দেখে নিজের খাদ্যাভ্যাস বা চিকিৎসা পরিবর্তন করা উচিত নয়। দীর্ঘদিনের অস্বাভাবিক উপসর্গ বা cortisol নিয়ে উদ্বেগ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
তথ্যসূত্র:
১. Nutrients Journal (2020): The Effects of Magnesium Supplementation on Subjective Anxiety and Stress—A Systematic Review. ২. Molecular Psychiatry (2021): Omega-3 supplementation lowers inflammation and anxiety in medical students. ৩. Psychopharmacology: Vitamin C supplementation attenuates the increases in circulating cortisol, adrenaline and anti-inflammatory polypeptides following ultramarathon running. ৪. Harvard Health Publishing: Diet and Stress – The Gut-Brain Connection